জুন ১৭, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

+৮৮০১৭৪৪-২২১৩৮৫

আমাদের প্রিয় আজাদ উদ্দিন : একজন আলোকিত মানুষের স্মৃতিচারণ

  • Views: 2186
  • Share:
জুন ১৬, ২০২৬ ২২:২৬ Asia/Dhaka

প্রফেসর ড. মো. দিদার চৌধুরী:: “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং কিয়ামতের দিন তোমরা পূর্ণ প্রতিদান প্রাপ্ত হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলকাম। বস্তুত পার্থিব জীবন প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।” — সূরা আলে ইমরান : ১৮৫

কোরআনের এই অমোঘ বাণীর মতোই মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের জীবনের শেষ দিনটিও নির্ধারিত হয়ে যায়। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, মহাকালের আহ্বান একদিন আমাদের কাছে পৌঁছাবেই। পবিত্র কুরআনের সূরা নিসা : ৭৮ আরও বলা হয়েছে—
“যেখানেই তোমরা থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের পাকড়াও করবেই; এমনকি যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গেও অবস্থান কর।”

মৃত্যু অবধারিত হলেও কিছু প্রিয়জনের আকস্মিক বিদায় হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, স্মৃতিকে করে তোলে গভীর বেদনায় ভারাক্রান্ত। পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তারা হারিয়ে যান না; তাদের আদর্শ, সততা, মানবিকতা এবং জনকল্যাণমূলক কর্ম মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকে যুগের পর যুগ। জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মহৎ কর্মের প্রভাব চিরস্থায়ী।

মানুষের জীবনের প্রকৃত পরিমাপ তার আয়ুর দৈর্ঘ্যে নয়, বরং তার কর্মের বিস্তারে নিহিত। কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েও মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত থাকেন তাঁদের কর্ম ও আদর্শের মাধ্যমে। আমাদের প্রিয় বন্ধু শিক্ষক, সংগঠক ও সমাজসেবক আজাদ উদ্দিন ছিল তেমনই একজন আলোকিত মানুষ, যে তাঁর কর্ম, চিন্তা ও মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।

শাহগলী আদর্শ শিশু বিদ্যানিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, কানাইঘাট সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক, বারহাল ডিগ্রি কলেজের ম্যানেজিং কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য এবং সিলেট ফিটনেস ক্লাবের বারবার নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে সে দায়িত্ব পালন করেছে নিষ্ঠা, সততা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে। তবে এসব পরিচয়ের চেয়েও বড় ছিল তাঁর মানুষ হিসেবে পরিচয়।

আজাদ উদ্দিন ছিল অত্যন্ত বিনয়ী, মিষ্টভাষী, পরোপকারী ও মিশুক স্বভাবের মানুষ। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে ও মানুষের হৃদয় জয় করতে জানত সে। দেখা হলেই তাঁর মুখে ফুটে উঠত আন্তরিক হাসি, আর সেই হাসিতেই যেন গলে যেত দূরত্বের দেয়াল। কোনো সভা-সমাবেশে নিজের জন্য বিশেষ স্থান দাবি না করে সে বন্ধুদের সম্মানিত করত। নিজের আসন ছেড়ে অন্যকে বসতে দেওয়া, অনুষ্ঠানে সবার মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অন্যের সাফল্যকে সামনে নিয়ে আসা এবং নিজেকে আড়ালে রাখা ছিল তাঁর সহজাত বৈশিষ্ট্য। সে বিশ্বাস করত-একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা অন্যকে মর্যাদা দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।

বন্ধুদের যেকোনো সমস্যা সামনে এলে প্রথমেই যার মুখটি ভেসে উঠত, সে ছিল আজাদ। কোনো বন্ধু বিপদে পড়লে সহায়তার জন্য ফান্ড সংগ্রহে সে-ই থাকত সবার আগে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত সহযোগিতার ব্যবস্থা করত। কারও বিপদ যেন তাঁর নিজেরই বিপদ হয়ে উঠত।

কারও বদলি বা চাকুরী সংক্রান্ত সমস্যা, চাকরির ব্যবস্থা, পারিবারিক বা সামাজিক কোনো সমস্যায়ও সে ছিল নির্ভরতার প্রতীক। আবার কোনো বন্ধু ব্যক্তিগত বা পেশাগত সাফল্য অর্জন করলে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা বা সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজনেও আজাদ থাকত সবার আগে; বন্ধুর অর্জন মানে তারই অর্জন।  বিদেশ থেকে কোনো বন্ধু দেশে ফিরলে সবাইকে নিয়ে পুনর্মিলনীর আয়োজন করা যেন ছিল তাঁর নেশা। চমৎকার উপস্থাপনা, রসবোধ এবং প্রাণবন্ত কথামালার মাধ্যমে সে যেকোনো অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তুলত। সবাইকে একসূত্রে গাঁথার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।

নিজের জন্মভূমির প্রতি ছিল তাঁর গভীর ভালোবাসা। প্রিয় শাহগলী ও বারহাল অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে সে সবসময় ভাবত। এলাকার শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠা করে শাহগলী আদর্শ শিশু বিদ্যানিকেতন। তরুণ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত, সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বারহাল ছাত্রকল্যাণ পরিষদকে নিয়মিত পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ক্যারিয়ার সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের মতো বিষয়ে যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে সে নিরলসভাবে কাজ করে গেছে।

দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তাঁর এলাকায় নিয়ে এসে তরুণদের সামনে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করত। তাঁর বিশ্বাস ছিল- যোগ্য মানুষের সান্নিধ্য ও অভিজ্ঞতার আলো তরুণদের জীবনগঠনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এভাবেই সে নতুন প্রজন্মের সামনে অনুসরণীয় আদর্শ স্থাপন করতে চেয়েছে। সিলেট এম.সি. কলেজের পদার্থবিজ্ঞান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, “বন্ধু চিরন্তন”-এর অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা, এম.সি. কলেজ এইচএসসি ৯০ ব্যাচের পুনর্মিলনীর সংগঠক এবং এসএসসি ১৯৮৮ ব্যাচের সক্রিয় সদস্য হিসেবে সে এমন অসংখ্য সামাজিক সংগঠন ও বন্ধুত্বের বন্ধনে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিল। মানুষে মানুষে সংযোগ স্থাপনের এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। সে যেন ছিল এক সেতুবন্ধন-বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুত্বের, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের, পরিচিতের সঙ্গে অপরিচিতের।

আজাদ ছিল বিজ্ঞানমনস্ক ও চিন্তাশীল মানুষ। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে সৃষ্টি ও সৃষ্টির রহস্য নিয়ে তাঁর ছিল গভীর কৌতূহল। বিশেষ করে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় বিষয়। মহাবিশ্ব, প্রকৃতি, জীবন ও অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন তাঁকে ভাবাত। সে এসব বিষয়ে লিখেছে, আলোচনা করেছে এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছে।

কানাইঘাট সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করে সে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন আলোকিত করেছে। পদার্থবিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়কে সহজ, সাবলীল ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। তাঁর শিক্ষার্থীরা আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সেই প্রিয় শিক্ষককে, যিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেননি; শিখিয়েছেন জীবনকে বুঝতে, প্রশ্ন করতে, সত্যকে অনুসন্ধান করতে এবং চিন্তার স্বাধীনতা অর্জন করতে।

স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। সিলেট ফিটনেস ক্লাবের মাধ্যমে সে অসংখ্য মানুষকে স্বাস্থ্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছে।  সুস্থ দেহ, সুস্থ মন এবং সুস্থ সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে সে আজীবন কাজ করে গেছে। আধুনিক চিন্তার পাশাপাশি আজাদ ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক নিবেদিতপ্রাণ ধারক। বাংলার সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনকে সে অত্যন্ত মূল্য দিতে জানত। শীতকালীন পিঠা উৎসবসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে সে মানুষকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে সচেষ্ট ছিল। আজাদ বিশ্বাস করত-যে জাতি তার সংস্কৃতিকে ধারণ করতে পারে না, সে জাতি তার আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলে।

আজাদ উদ্দিনের জীবনে ছিল অনেক স্বপ্ন, অনেক পরিকল্পনা। সমাজের জন্য আরও অনেক কিছু করার আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে আমাদের মাঝ থেকে ডেকে নিয়েছেন। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো আজ আমাদের কাছে একেকটি অঙ্গীকার হয়ে আছে। তাঁর প্রস্থান শুধু একটি পরিবারের নয়; একটি সমাজের, বন্ধুমহলের ও একটি প্রজন্মের অপূরণীয় ক্ষতি।

আজ আজাদ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর হাসিমাখা মুখ, আন্তরিক আচরণ, বন্ধুবৎসল মন, সেবাপরায়ণতা এবং সমাজের জন্য নিবেদিত কর্ম আমাদের স্মৃতিতে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়- নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য বাঁচতে হয়; পরিচয়ের জন্য নয়, কর্মের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে হয়।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিগুলোর মতো আজ হৃদয়ে অনুরণিত হয়—
এই খেদ মোর মনে—
ভালবেসে মিটল না আশ,
কুলাল না এ জীবনে।
হায়— জীবন এত ছোট কেনে,
এ ভুবনে?

সত্যিই, আজাদ আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু তাঁর কর্ম, আদর্শ ও মানবিকতার দীপ্তি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।
মহান আল্লাহ মরহুম আজাদ উদ্দিনকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন, তাঁর জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিন এবং তাঁর পরিবার, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন।
আমিন।
লেখক:
প্রফেসর ড. মো. দিদার চৌধুরী
পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, সিলেট অঞ্চল।

user
user
Ad
Ad