অক্টোবার ২৮, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আল্লাহ কেন মানুষকে বিপদ এবং অসুস্থতা দিয়ে পরীক্ষা করেন?

অক্টোবার ২৮, ২০২৬ ১১:৩৫ Asia/Dhaka
  • Views: 17
  • Share:
মোশাররফ ইবনে রুকন, টিবিসি সম্পাদিত

মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সবই যেন এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। কখনো জীবন ভরে ওঠে আনন্দে, আবার কখনো দুঃখের ভারে নুয়ে পড়ে মানুষ। কেউ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেন, কেউ দারিদ্র্যের কষ্টে দিন কাটান। আবার কেউ প্রাচুর্যের মধ্যেও নানা সংকটে পতিত হন। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জাগে আল্লাহ কেন মানুষকে পরীক্ষা করেন? তিনি তো সর্বশক্তিমান, পরম দয়ালু এবং সর্বজ্ঞ। তাহলে তাঁর সৃষ্টিকে এত কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয় কেন?

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষের ঈমান, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, নৈতিকতা এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার পরিচয় প্রকাশ পায়। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মুলকের দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন—কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম।” এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, জীবনের মূল উদ্দেশ্য কেবল বেশি সম্পদ অর্জন নয়। বরং কে উত্তম কাজ করে, কে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে এবং কে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ তাআলা মানুষের বাহ্যিক অবস্থার চেয়ে তার কর্ম, নিয়ত এবং নৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেন। কেউ দরিদ্র হয়েও আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান হতে পারেন, আবার কেউ বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েও পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে পারেন। সূরা আল-আনকাবুতের দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেন, “মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর অবশ্যই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি। অতঃপর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।”  অর্থাৎ, ঈমানের দাবি শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই ঈমানের প্রমাণ দিতে হয়।

আল্লাহর পরীক্ষা মানুষের অজানা কোনো বিষয় জানার জন্য নয়। তিনি সর্বজ্ঞ; মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তাঁর কাছে সুস্পষ্ট। বরং পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তর্নিহিত বিশ্বাস ও নৈতিক অবস্থান বাস্তব জীবনে প্রকাশিত হয়। মানুষ নিজের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে, সে কতটা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী।

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ১৫৫–১৫৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা তাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ তাদের ওপরই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও রহমত, আর তারাই সৎপথপ্রাপ্ত।” এই আয়াতগুলোতে মানুষের জীবনের নানা সংকটের কথা বলা হয়েছে। ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ক্ষতি, প্রিয়জনের মৃত্যু কিংবা ফসলহানি সবই পরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখা এবং ন্যায়সংগত উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন প্রতিটি বিপদই আল্লাহর শাস্তি নয়। কোনো বিপদ মানুষের ভুল বা অন্যায়ের পরিণতি হতে পারে, আবার কোনো বিপদ হতে পারে ঈমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা। তাই কারও দুঃখ-কষ্ট দেখে তাকে আল্লাহর শাস্তিপ্রাপ্ত বলে মন্তব্য করা উচিত নয়।

শুধু সাধারণ মানুষই না, নবী-রাসুলদের জীবনেও ছিল কঠিন পরীক্ষা। মানুষের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান ছিলেন নবী-রাসুলগণ। অথচ তাঁদের জীবনও ছিল পরীক্ষা ও সংগ্রামে পরিপূর্ণ। তাঁরা কখনো দারিদ্র্য, কখনো অসুস্থতা, কখনো বিরোধিতা, আবার কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনার সম্মুখীন হয়েছেন। হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘদিন অসুস্থতার কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। পবিত্র কুরআনে তাঁর দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে: “আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” (সূরা আল-আম্বিয়া, ৮৩)

অন্যদিকে, হজরত ইউসুফ (আ.) শৈশবে আপন ভাইদের ষড়যন্ত্রের শিকার হন, কূপে নিক্ষিপ্ত হন, পরে মিথ্যা অভিযোগে কারাবরণ করেন। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা তাঁকে সত্য ও ন্যায় থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে তিনি ক্ষমতা লাভ করেও নিজের ভাইদের ক্ষমা করে দেন। এই ঘটনাগুলো আমাদের শিক্ষা দেয়, বিপদ মানুষের মর্যাদা কমিয়ে দেয় না। বরং সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারলে তা মানুষের চরিত্রকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে।

ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরামের জীবন পরীক্ষার অসাধারণ উদাহরণ। তাঁদের ঈমান ছিল দৃঢ়, কিন্তু তাঁদের জীবনও ছিল অত্যন্ত কঠিন। হজরত বিলাল (রা.)-এর কথা স্মরণ করা যায়। ইসলাম গ্রহণের পর মক্কার কাফিররা তাঁকে নির্মম নির্যাতন করত। উত্তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে তাঁর বুকে ভারী পাথর চাপা দেওয়া হতো। তবুও তিনি বারবার উচ্চারণ করতেন, “আহাদ, আহাদ” অর্থাৎ আল্লাহ এক, আল্লাহ এক। তাঁর এই অবিচল বিশ্বাস প্রমাণ করে, শারীরিক নির্যাতন মানুষের ঈমানকে পরাজিত করতে পারে না, যদি সে আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থা রাখে। হজরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) ছিলেন মক্কার এক সম্ভ্রান্ত ও বিলাসী পরিবারের সন্তান। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি উন্নত পোশাক পরতেন এবং আরামদায়ক জীবনযাপন করতেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁকে পারিবারিক সম্পদ ও আরাম-আয়েশ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তবুও তিনি দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি। পরবর্তী সময়ে তিনি মদিনায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত সফলতা সম্পদ বা বিলাসিতায় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যে নিহিত।

হজরত আবু বকর (রা.)-এর জীবনেও ছিল নানা পরীক্ষা। হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে গুহায় অবস্থানকালে শত্রুরা তাঁদের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, “দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আত-তাওবা, ৪০)

এই ঘটনা আমাদের শেখায়, কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা মানুষের অন্তরে প্রশান্তি এনে দিতে পারে।

এমনকি বিপদে মুমিনের জন্য রয়েছে কল্যাণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। যদি তার সুখ আসে, তবে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে; ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তার দুঃখ আসে, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে; ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯)। অর্থাৎ, আল্লাহর পরীক্ষা শুধু বিপদে সীমাবদ্ধ নয়। সম্পদ, ক্ষমতা, সাফল্য, জনপ্রিয়তা এবং সুস্বাস্থ্যও পরীক্ষা। একজন ধনী ব্যক্তি তাঁর সম্পদ কীভাবে ব্যয় করেন, একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি কীভাবে মানুষের সঙ্গে আচরণ করেন, একজন শিক্ষিত ব্যক্তি তাঁর জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করেন এসবও পরীক্ষার অংশ।

তাই মানব জীবনে আল্লাহর পরীক্ষা দিতেই হবে। তবে পরীক্ষার সময় একজন মুমিনের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আল্লাহর প্রতি আস্থা রেখে সঠিক উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিজের ভুল ও অন্যায় পর্যালোচনা করতে হবে। কোনো বিপদ আমাদের আত্মসমালোচনা, তওবা এবং সংশোধনের সুযোগ করে দিতে পারে। আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না। পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শরহের পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াতে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।” দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী; আর আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদানই একজন মুমিনের চূড়ান্ত প্রত্যাশা।

লেখক: মোশাররফ ইবনে রুকন
কামিল প্রথম বর্ষ, তাফসীর বিভাগ, ইসলামীক আরাবিক বিশ্ববিদ্যালয়
 

user
user
Ad
Ad