নারী শিক্ষায় বেগম রোকেয়ার দর্শন: আজও কেন প্রাসঙ্গিক?
সুমাইয়া রহমান: শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। এটি ব্যক্তি ও সমাজের উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু একসময় বাংলার নারীরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন সময়ে নারীশিক্ষার পক্ষে সাহসী ভূমিকা রাখেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীর মুক্তির অন্যতম প্রধান পথ শিক্ষা।
শিক্ষাই নারীর মুক্তির পথ
বেগম রোকেয়ার কাছে শিক্ষা শুধু অক্ষরজ্ঞান ছিল না। শিক্ষা ছিল চিন্তার স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যম। তিনি চেয়েছিলেন, নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবেন। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নেবেন। সমাজের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। তাঁর সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থে এই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। সেখানে তিনি এমন এক সমাজের কল্পনা করেছেন, যেখানে নারীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে। তাঁরা সমাজ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এর মাধ্যমে রোকেয়া দেখিয়েছেন, সুযোগ পেলে নারীরাও অসাধারণ অবদান রাখতে পারেন। তাঁর অবরোধবাসিনী গ্রন্থেও নারীর বন্দিত্বের চিত্র উঠে এসেছে। তিনি দেখিয়েছেন, সামাজিক কুসংস্কার কীভাবে নারীর স্বাভাবিক জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে।
বাস্তব জীবনে রোকেয়ার দর্শন
বেগম রোকেয়ার আদর্শ আজও আমাদের সমাজে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের মেয়েরা এখন বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। তাঁরা চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসক ও উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু সবার জন্য সমান সুযোগ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবুও নারীরা শিক্ষায় অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। একসময় মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। এখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন জরিপেও এই অগ্রগতির চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের Literacy Assessment Survey অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সী নারীদের সাক্ষরতার হার ছিল ৫৮.২৪ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬২.৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ সাক্ষরতার সামগ্রিক হারে এখনো পুরুষেরা এগিয়ে। তবে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণের চিত্র আশাব্যঞ্জক।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৩ অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ৫০.৫২ শতাংশ ছিল মেয়ে। জুনিয়র মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল ৫৫ শতাংশের বেশি। মাধ্যমিক পর্যায়েও মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের তুলনায় বেশি ছিল।
বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার ডেটা পোর্টালে প্রকাশিত ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ছিল মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রায় ৮৪.৭ শতাংশ। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬৩.৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান দেখায়, নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়লেই সব বাধা দূর হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও উচ্চশিক্ষার ব্যয় এখনো অনেক মেয়ের সামনে বাধা তৈরি করে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও হাওর এলাকার মেয়েরা যোগাযোগের সমস্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার একটি মেয়ের কথা ধরা যাক। বর্ষাকালে তার বিদ্যালয়ে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারের আর্থিক সংকটও তার পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি করে। কোনো কোনো পরিবারে অল্প বয়সে বিয়ের চাপ আসে। ফলে মেধাবী হয়েও অনেক মেয়ের শিক্ষাজীবন থেমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উপবৃত্তি, নিরাপদ যাতায়াত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। পরিবারকেও মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে হবে। রাষ্ট্রকে পিছিয়ে পড়া এলাকার মেয়েদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। এসব পদক্ষেপই রোকেয়ার দর্শন বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও জরুরি
বেগম রোকেয়া নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বুঝেছিলেন, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা নারীর স্বাধীনতাকে সীমিত করে। তাই নারীর শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষিত নারী যখন নিজের আয় করতে পারেন, তখন তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে। তিনি পরিবারের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে সমাজের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখেন। তাই নারীদের মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে হবে।
নারীর কাজের নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।বেগম রোকেয়া দেখিয়েছেন, নারীশিক্ষা সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম। একটি মেয়েকে শিক্ষিত করা মানে তার সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া। এর সুফল পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাই পায়। তাই আজ আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, কোনো মেয়ের শিক্ষা যেন দারিদ্র্য, কুসংস্কার কিংবা বৈষম্যের কারণে বন্ধ না হয়। নারীকে শিক্ষিত, আত্মনির্ভর ও মর্যাদাবান করে তোলার মধ্য দিয়েই বেগম রোকেয়ার স্বপ্নের সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক: সুমাইয়া রহমান
শিক্ষার্থী, দিরাই সরকারি কলেজ
- বাড়ছে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার
- স্নাতকোত্তর-পিএইচডির সুযোগ দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি
- ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষককে গণধোলাই
- খাতা মূল্যায়নে অনিয়ম করলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
- কলেজে ভর্তির সুযোগ চান এসএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা
- উচ্চতর গ্রেডে বৈষম্য নিরসনের দাবিতে দুই মাসের আলটিমেটাম শিক্ষকদের
- বিশ্বনাথে ২ পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১জনের মৃত্যু, আটক- ৩
- সাস্টিয়ানদের মৃত্যুর বছর ২০২৬: দশ মাসে ৭ শিক্ষার্থী হারাল শাবিপ্রবি
- সরকারের শিক্ষাবৃত্তি পাবে প্রবাসীদের সন্তানরা
- এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে-স্কেল নিয়ে নতুন যে তথ্য দিলেন মাউশি ডিজি
- বাড়ছে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার
- সাস্টিয়ানদের মৃত্যুর বছর ২০২৬: দশ মাসে ৭ শিক্ষার্থী হারাল শাবিপ্রবি
- সৌদির সব বিমানবন্দরে হামলার হুঁশিয়ারি হুথিদের
- সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসছে বিকেলে
- জুলাই শহীদ জুবায়েরের বোনের চিকিৎসায় পাশে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী
- মাদক ও অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করায় শিক্ষককে হত্যা
- শিক্ষকদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না: প্রধানমন্ত্রী
- প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেল ৩ জমজ বোন
- এক কলেজ থেকে মেডিকেলে চান্স পেলেন ৪৫ শিক্ষার্থী
- ইমাম, খতিব ও শিক্ষকদের জাতীয়ভাবে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণি ঘোষণার দাবি


MS3 Technology BD