নভেম্বার ৬, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৭ নভেম্বর ১৯৭৫: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা

নভেম্বার ৬, ২০২৬ ২১:৪৬ Asia/Dhaka
  • Views: 24
  • Share:
অধ্যাপক ড. জি. এম. রাবিউল ইসলাম

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা কখনো সরলরেখায় এগোয়নি। কখনো সংসদীয় প্রত্যাশা, কখনো একদলীয় কাঠামো, কখনো সামরিক শাসন, আবার কখনো গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা—এই বন্ধুর পথেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ৭ নভেম্বর ১৯৭৫। দিনটিকে কেউ ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বলেন, কেউ দেখেন সামরিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস হিসেবে।

 ব্যাখ্যা যা-ই হোক, রাষ্ট্র, সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে এর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধান সংসদীয় গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, কোটি মানুষের পুনর্বাসন, দুর্বল প্রশাসন ও খাদ্যঘাটতির বাস্তবতায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ ছিল না। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এই সংকটকে চরম রূপ দেয়। বন্যা, খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সংকোচনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। অমর্ত্য সেন তাঁর Poverty and Famines (১৯৮১) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সেই বছর মাথাপিছু খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা আগের কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল না; সংকট ছিল খাদ্যে প্রবেশাধিকারের।

দুর্ভিক্ষের দায় নিয়ে তৎকালীন সরকার ও তার নেতৃত্বের দিকেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের যুক্তি, আগাম আভাস থাকা সত্ত্বেও সময়মতো আমদানি, মজুত ও বণ্টনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; রেশনিংয়ে অনিয়ম, মজুতদারি ও সীমান্তপথে চোরাচালান ঠেকানো যায়নি; লঙ্গরখানার মতো ত্রাণ-ব্যবস্থা চালু হয়েছে দেরিতে। তাঁদের মতে, দলীয় আনুগত্যনির্ভর প্রশাসন, দুর্নীতি ও জবাবদিহির ঘাটতি একটি সংকটকে মানবিক বিপর্যয়ে রূপ দেয়। সরকারের সমর্থকেরা বলেন, তেল ও আন্তর্জাতিক খাদ্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, যুদ্ধোত্তর দুর্বল অবকাঠামো, বন্যার তীব্রতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যসহায়তায় বিলম্বই ছিল প্রধান কারণ। ইতিহাসবিদদের মূল্যায়নে দুর্ভিক্ষ বহু কারণের সমন্বিত ফল; তবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায় থেকে সরকার মুক্ত নয়, এ কথাও বহু গবেষক বলেন।

দুর্ভিক্ষের রাজনৈতিক পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। জনআস্থা কমে যায়, অসন্তোষ বাড়ে, এবং ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে জরুরি অবস্থা জারি করে মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থার জায়গায় রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হয়, পরে বাকশালের অধীনে একদলীয় কাঠামো গড়ে ওঠে। সমর্থকদের যুক্তি ছিল, জাতীয় সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব প্রয়োজন। সমালোচকদের মতে, শাসনব্যর্থতার জবাবে জবাবদিহি বাড়ানোর বদলে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করা হয়; সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার সীমিত হয়, বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হয় এবং পরে সংবাদপত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল দ্রুত সিদ্ধান্তে নয়; ভিন্নমতের স্বীকৃতি ও ক্ষমতার জবাবদিহির মধ্যেও তা নিহিত।

এই পর্বে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও পরে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ। সমালোচকদের যুক্তি, সরকারপ্রধান ও দলের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দুর্ভিক্ষ-পূর্ব ও দুর্ভিক্ষকালীন ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় তাঁর ও তাঁর দলের ওপরই বর্তায়। তাঁদের অভিযোগ, ১৯৭২ সালে গঠিত জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ উঠেছিল; ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিনা বিচারে আটকের বিধান রাখা হয়; আর চতুর্থ সংশোধনীতে সংসদীয় ব্যবস্থা ও বহুদলীয় রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার সীমিত করা হয়, বাকশাল গঠিত হয় এবং ১৯৭৫ সালের জুনে মাত্র চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকিগুলো বন্ধ করা হয়। তাঁদের মতে, মৌলিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সংবিধান চালু হওয়ার দুই বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই একদলীয় ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া ১৯৭১ সালের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না; ফলে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক শূন্যতার পটভূমি রচনায় আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিই বড় ভূমিকা রেখেছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা অবশ্য বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সশস্ত্র বিদ্রোহ, চোরাচালান ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল এবং এসব সিদ্ধান্ত ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের আগস্টে ক্ষমতার আকস্মিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। সামরিক শক্তির মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের এই ঘটনা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটে এবং সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। একই সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান—নিহত হন। ৬ নভেম্বর মোশতাক পদত্যাগ করলে প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সাংবিধানিক কর্তৃত্বের জায়গা তখন নিচ্ছে সামরিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।

এই প্রেক্ষাপটেই ৭ নভেম্বরের ঘটনা ঘটে। সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ, সৈনিকদের মধ্যে বৈষম্য ও ক্ষোভ, জাসদের গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার তৎপরতা এবং ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিস্থিতিকে বিস্ফোরণোন্মুখ করে তোলে। সৈনিকদের অংশগ্রহণে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনায় জিয়াউর রহমান মুক্ত হন; খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দারসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন, বিশৃঙ্খলায় আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারান। যাঁরা একে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বলেন, তাঁরা দেখেন সামরিক-বেসামরিক জনতার অংশগ্রহণে এক রাজনৈতিক মোড় ঘোরানো; যাঁরা একে সামরিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস বলেন, তাঁদের উদ্বেগ—রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যই নির্ণায়ক হয়ে উঠেছিল।

এরপর জিয়াউর রহমান ক্রমে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন—১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে। তাঁর সমর্থকেরা কয়েকটি দিকে তাঁর ভূমিকা তুলে ধরেন। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে অংশগ্রহণ এবং ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ; তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাব পান। দ্বিতীয়ত, ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দল বিধির মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনীতির পথ খোলা, ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন এবং একই বছর সামরিক আইন প্রত্যাহার; সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়ী হয়। তৃতীয়ত, খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামোন্নয়নে জোর, ‘খাল খনন কর্মসূচি’, ১৯ দফা কর্মসূচি এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহ—যার পথ ধরে পরে তৈরি পোশাক শিল্পসহ রপ্তানি বহুমুখীকরণের ভিত্তি তৈরি হয় বলে অনেকে মনে করেন। চতুর্থত, মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির সূচনাকালে সহায়ক পরিবেশ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাবক হিসেবে ভূমিকা, যা পরে সার্ক গঠনের পথ তৈরি করে। সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন সামরিক শাসনের বৈধতা, ক্ষমতার সামরিক উৎস, সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে। দায়িত্বশীল মূল্যায়নে কোনো ব্যক্তিকে একমাত্রিকভাবে না দেখে তাঁর সময়ের অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব একসঙ্গে বিবেচনা করাই যথার্থ।

মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে তাঁর সমর্থকেরা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে দেখেন। তখন তিনি চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫–২৬ মার্চের রাতে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের আদেশ অমান্য করে তিনি বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন এবং ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন; পরে এই ঘোষণা শেখ মুজিবুর রহমানের নামে পাঠ করা হয়। যুদ্ধের শুরুতে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন, পরে ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হন এবং তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ‘জেড ফোর্স’ ছিল মুক্তিবাহিনীর প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড। সমর্থকদের যুক্তি, যিনি যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা করেছিলেন এবং সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে ‘বীর উত্তম’ খেতাব পেয়েছেন, তাঁর স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

৭ নভেম্বর-পরবর্তী পর্যায় ছিল একদলীয় কাঠামো থেকে বহুদলীয় রাজনীতিতে ফেরার সূচনা। তাঁদের যুক্তি, বাকশালের অধীনে রুদ্ধ হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক দল ও সংবাদমাধ্যমের পরিসর আবার খুলে দেওয়া এবং ভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় যাচাইয়ের পথ তৈরি করাই জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অবদান। তাঁরা আরও মনে করেন, ৭ নভেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করেছে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের একটি প্রধান ধারা পরিচালিত হয় বিএনপির নেতৃত্বে; ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসে এবং ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়। সমালোচকেরা অবশ্য মনে করেন, জিয়াউর রহমানের এসব পদক্ষেপ সামরিক শাসনের কাঠামোর মধ্যেই নেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তী দশকগুলোতে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পথ আরও আঁকাবাঁকা হয়েছে। ১৯৮২ সালে আবার সামরিক শাসন জারি হয়; ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তার অবসান ঘটে এবং ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরা হয়। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়, ২০১১ সালে তা বাতিল হয়; নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও রাজনৈতিক সংঘাত আমাদের গণতন্ত্রকে বারবার পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের আলোচনা আবার সামনে এসেছে। এই পুরো যাত্রাপথ থেকে স্পষ্ট হয়, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজন নয়; এটি ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা। নির্বাচিত সরকারও জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়; আবার সামরিক হস্তক্ষেপ কখনোই গণতান্ত্রিক ঘাটতির স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামল (২০০৯–২০২৪) নিয়ে সমালোচকদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁদের মতে, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সমতল ক্ষেত্র নষ্ট করেছে; ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বর্জন করায় ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন; ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ ওঠে; ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনও বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করে। তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, এ সময়ে বিরোধী নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার এবং বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনেরই অংশ। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগে বহু মানুষ নিহত হন; জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে এ সংখ্যা ১,৪০০ পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। এই সমালোচকদের মূল্যায়নে, ১৯৭৫ সালের একদলীয় প্রবণতা ২০০৯-পরবর্তী সময়ে নতুন রূপে ফিরে এসেছিল। আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থকেরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন; তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হয়েছে, বিএনপির বর্জন ছিল তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, এবং ওই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে।

৭ নভেম্বর তাই কোনো একটি দলের জয়-পরাজয়ের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—জনগণের ভোট ও সংবিধান, নাকি অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনী সংবিধানসম্মত কর্তৃপক্ষের অধীনে জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে; রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তার হাতে ন্যস্ত হতে পারে না। একইভাবে বেসামরিক নেতৃত্বের দায়িত্ব সামরিক বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করা এবং তার পেশাদারিত্ব রক্ষা করা। আর সংকটের সমাধান শুধু নেতৃত্ব বদলে হয় না; গভীরে থাকে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহির অভাব, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নাগরিক আস্থার ঘাটতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও প্রশাসক হিসেবে আমার বিশ্বাস, অতীতের রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত মুক্তবুদ্ধি, তথ্যনিষ্ঠা ও যুক্তিনির্ভর মূল্যায়নের ভিত্তিতে। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান নয়; নাগরিক সচেতনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলারও ক্ষেত্র। শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো একটি ব্যাখ্যা চাপিয়ে না দিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য, দলিল ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের সক্ষমতা তৈরি করাই শিক্ষার দায়িত্ব। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ আমাদের কয়েকটি শিক্ষা দিয়ে গেছে। প্রথমত, রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধান ও আইনের শাসনের বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, মতপার্থক্য ও সংকটের সমাধান হতে হবে গণতান্ত্রিক আলোচনায়, সহিংসতা বা সামরিক হস্তক্ষেপে নয়। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত বা দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। চতুর্থত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, ক্ষমতার বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া থেকে—অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে নয়। কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে তখনই, যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ হবে সাংবিধানিক, ক্ষমতার প্রয়োগ হবে জবাবদিহিমূলক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হবে জনগণের সম্মতি।

 

লেখক: অধ্যাপক ড. জি. এম. রাবিউল ইসলাম
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

 

user
user
Ad
Ad