নভেম্বার ৬, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গবেষণায় ভয়ংকর দুঃসংবাদ

ভাত-তরকারি রান্নার হাঁড়ি থেকে সিসা ঢুকছে মানবদেহে

নভেম্বার ৬, ২০২৬ ১৭:৪৯ Asia/Dhaka
  • Views: 1429
  • Share:

দেশে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার হাঁড়ি থেকে রান্না করা খাবারে বিষাক্ত ধাতু সিসা মিশতে পারে। বিশেষ করে নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার রান্নার সময় খাবারে সিসার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকেরা বলছেন, সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। এ ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ রান্নার পাত্র নিশ্চিত করা এবং পরিবারগুলোর জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলের বিনিময়ে নতুন তৈজসপত্র কিংবা পুরোনো কাপড় নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে গবেষণাটিতে এ ধরনের বিনিময়প্রথা নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়নি। গবেষকেরা বলছেন, কোনো হাঁড়ি নতুন বা চকচকে হলেই সেটি নিরাপদ—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।

স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পুরোনো ও পরিত্যক্ত ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব ধাতুতে সিসার উপস্থিতি যাচাই না করলে তা নতুন হাঁড়িতেও থেকে যেতে পারে। সিসার সংস্পর্শ শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও আচরণে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে নিরাপদ বলা যায়।

নেচার প্রকাশিত জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে খাবারে কতটা সিসা মিশে যায় এবং খাবারের অম্লতা, হাঁড়ি পরিষ্কার ও রান্নার পদ্ধতি এ প্রক্রিয়ায় কী প্রভাব ফেলে, তা পরিমাপ করাই ছিল গবেষণার উদ্দেশ্য।

গবেষণায় স্থানীয় পরিবারগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত হাঁড়ি এবং একজন সরবরাহকারীর কাছ থেকে কেনা ২০টি নতুন হাঁড়ি পরীক্ষা করা হয়। প্রথমে প্রতিটি হাঁড়ির ধাতুতে সিসার পরিমাণ নির্ণয় করেন গবেষকেরা। পরে হাঁড়িগুলো গরম করে তাতে সাধারণ ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়। এরপর অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার পদ্ধতিতে খাবার ও তরলে সিসার পরিমাণ পরিমাপ করা হয়।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথ বিভাগের প্রজেক্ট আনলেডেডের পরিচালক ড. জেনা ফোরসিথ বলেন, ‘আমরা হাঁড়ি এবং সেই হাঁড়িতে রান্না করা খাবার—দুটিতেই সিসার উপস্থিতি পরিমাপ করেছি। এর মাধ্যমে প্রতিদিনের ব্যবহারের একটি সাধারণ রান্নার হাঁড়ি কীভাবে সিসার সংস্পর্শের উৎস হয়ে উঠতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করেছি।’

পরীক্ষা করা প্রতিটি হাঁড়ি থেকেই খাবারে সিসা মিশেছে। নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার রান্না করা ভাতে প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। তুলনা হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) নির্ধারিত মান অনুযায়ী, শিশু ও ছোটদের জন্য তৈরি খাবারে সিসার সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম।

একই হাঁড়িতে বারবার রান্না করার সঙ্গে খাবারে সিসার পরিমাণ কমেছে। তবে তৃতীয়বার ব্যবহারের পরও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সাতটি পুরোনো হাঁড়ির মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসা পাওয়া গেছে।

হাঁড়ি ব্যবহারের ধরন ও পরিষ্কার করার পদ্ধতিও খাবারে সিসা মেশার পরিমাণে প্রভাব ফেলেছে। নতুন হাঁড়ি স্টিলের তারযুক্ত স্ক্রাবার দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে না ঘষে পরিষ্কার করার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা নির্গত হয়েছে। ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমনের পরিমাণ বেড়েছে।

গ্রামাঞ্চলের শিশুদের প্রতিদিনের ভাত খাওয়ার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে গবেষকেরা হিসাব করেছেন, এ ধরনের হাঁড়িতে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবার থেকে দৈনিক সিসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএর নির্ধারিত মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি গ্রহণ করতে পারে। তবে এটি শিশুদের ওপর সরাসরি পরীক্ষা করে পাওয়া ফল নয়; গবেষকদের তৈরি একটি মডেলভিত্তিক হিসাব।

আইসিডিডিআর,বির পরিবেশগত স্বাস্থ্য ও পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘পরিবারগুলো অনেক যত্ন নিয়ে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে। তাদের যেন এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে না হয় যে রান্নার হাঁড়ি থেকেই খাবারে সিসা মিশছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ছোট শিশুদের জন্য খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে, এমন রান্নার পাত্র বেছে নেওয়া উচিত। এসব হাঁড়ি ব্যবহার করতেই হলে স্টিলের তারযুক্ত স্ক্রাবার দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং অম্লীয় খাবার রান্না করা এড়িয়ে চলতে হবে। তবে এসব সতর্কতা দূষিত হাঁড়িকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে পারে না।’

ড. জেনা ফোরসিথ আরও বলেন, ‘সিসা দেখা যায় না, এর কোনো গন্ধ বা স্বাদও নেই। তাই দেখতে একেবারে ভালো একটি হাঁড়িও পরিবারের খাবারে সিসা মেশাতে পারে। কোন হাঁড়ি নিরাপদ, তা বোঝার কোনো উপায় পরিবারের হাতে নেই।’

গবেষকেরা মনে করেন, এ ঝুঁকি এড়ানোর দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশে হলুদে সিসা মেশানোসহ বিভিন্ন উৎস থেকে মানুষ সিসার সংস্পর্শে আসছে। রান্নার পাত্রও সিসার সংস্পর্শের আরেকটি উৎস। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, রান্নার পাত্রের নিরাপত্তাবিধি পর্যালোচনা, পুরোনো ধাতু বা স্ক্র্যাপ পরীক্ষা, তৈরি করা হাঁড়ি থেকে খাবারে সিসা নির্গত হওয়ার মাত্রা যাচাই এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকদের নিরাপদ কাঁচামাল ও পরীক্ষার সুবিধা নিশ্চিত করা।

আইসিডিডিআর,বির পরিবেশগত স্বাস্থ্য ও ওয়াশ বিভাগের ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণের আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে বিএসটিআইকে রান্নার পাত্রের জন্য সিসার স্পষ্ট নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ ও তা কার্যকর করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাশ্রয়ী দামের রান্নার পাত্রও নিরাপদ হওয়া উচিত। উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা ও কার্যকর তদারকির মাধ্যমে পরিবারগুলোকে এড়ানো সম্ভব এমন ঝুঁকি ছাড়াই প্রতিদিনের খাবার রান্নার সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে।’

গবেষকেরা জানিয়েছেন, গবেষণাটি পরীক্ষাগারভিত্তিক ও কারিগরিভাবে যথাযথ হলেও এর পরিসর ছোট। শিশুদের সিসা গ্রহণের পরিমাণ সরাসরি পরিমাপ না করে একটি মডেলের মাধ্যমে হিসাব করা হয়েছে। তাই অন্যান্য ধরনের রান্নার পাত্র ও দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাস নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

user
user
Ad
Ad